বিদ্যালয় বনাম একটি ভাল কোচিং সেন্টারের বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশে ডিসেম্বর মাস এলেই বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি তুমুল বেগে শুরু হয় বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তির প্রচার-প্রচারণাও। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার নিমিত্তে নানা ধরণের পোস্টার, হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে প্রচারের সাথে সাথে চলে মাইকিং। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, “দই ওয়ালা কখনো নিজের দই টক, এ কথা বলেনা”। কাজেই সকল কোচিং সেন্টারই নিজেদের কোচিং সব থেকে সেরা বলেই মনে করে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি সিগারেট কোম্পানীগুলোর মতো একটা লেবেল জুড়ে দিত, “কোচিং মেধাবীদের জন্য ক্ষতিকর” কিংবা গুড়ো দুধ উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলোর মত লেবেল জুড়ে দিত, “উত্তম জ্ঞান অর্জনের জন্য বিদ্যালয়ের কোন বিকল্প নেই” মনে হয় সেটাই হতো সঠিক প্রচারণা। আর বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক কোচিং সেন্টারই প্রচারপত্রে উল্লেখ করে থাকে, আমাদের বৈশিষ্ট্য-

  • দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, নিবেদিত প্রাণ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলী কর্তৃক পাঠদান।
  • ছাত্র-ছাত্রীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিকল্পিত সহ-পাঠ্যক্রম কর্মসূচী, শিক্ষা সফর, খেলাধূলা, চিত্রাঙ্কন ও হাতের লেখা প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান।
  • দূর্বল ছাত্র/ছাত্রীদের অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা।
  • ইংরেজী ও গণিত বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ।
  • ক্লাস টিউটোরিয়ালসহ মাসিক পরীক্ষা গ্রহণের বিশেষ ব্যবস্থা।
  • ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিকতা গঠনে বিশেষ তৎপর।
  • শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি ও পুরষ্কার প্রদানের ব্যবস্থা।
  • শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি সম্পর্কে অভিভাবকদের অবহিত করণ।
  • পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বৃত্তির উপযোগী করে গড়ে তোলা।
  • নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় মনোরম পরিবেশে পাঠদানের সুব্যবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি।

এজন্য অবশ্য আমি কোচিং সেন্টারগুলোকে কোন দোষারোপ করছি না। কারণ হাজার হোক, এটাতো তাদের ব্যবসা। কিন্তু আমি আসলে শিক্ষাটাকে ব্যবসা বলে মানতেই পারছি না। তাই আমার জিজ্ঞাসা, যদি উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো একটা কোচিং সেন্টারের থাকা উচিৎ কিংবা থাকা উত্তম হয়ে থাকে তাহলে একটা বিদ্যালয়ের কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিৎ? যদি একই বৈশিষ্ট্য বিদ্যালয়েরও থাকা উচিৎ কিংবা থেকে থাকে তাহলে একই সন্তানকে মানুষ করার জন্য কেন একজন অভিভাবক বিদ্যালয় ও কোচিং দু’জায়গাতেই ভর্তি করাবেন? উত্তর হতে পারে-

  1. সন্তানকে ডাবল শিক্ষায় শিক্ষিত করা।
  2. বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা নেই।
  3. সন্তানকে কোচিং এ ভর্তি করানোটা একটা ফ্যাশন।

সঠিক উত্তরটা আমি জানি না, তবে সন্তান দু’জায়গায় ভর্তি হয়ে ডাবল শিক্ষা অর্জন করবে এটাকে বোধ হয় পাগলের প্রলাপ বলা চলে। অন্যদিকে মেধা অর্জন যদি ফ্যাশনের মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়ে তাহলে সেখানে আর মেধা থাকে বলে আমার মনে হয় না। যদি ২ নং উত্তরটি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বলতে হয়, জনগণ যেসকল প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না, জনগণের টাকায় বেতন দিয়ে সেকল প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার কী দরকার? শিক্ষা যদি ব্যবসাই হয়ে থাকে, তাহলেতো কোন ব্যবসায়ীকে জনগণের টাকায় বেতন দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তারচেয়ে বরং বিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে কোচিং সেন্টারগুলোর সমকক্ষ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করা উচিৎ। এরফলে অনন্ততঃ দুটো লাভ হবে-

  1. বিদ্যালয়গুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।
  2. জনগণের টাকায় তাদেরকে আর বেতন দিতে হবে না।

বিখ্যাত দার্শনিক/সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটা মহৎ জাতি উপহার দিব”। সত্যি বলতে কি, বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা জানি না, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ উক্তি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ আমাদের দেশের শিক্ষিত মায়েরা সন্তানের জন্য ভাবেন ঠিকই, কিন্তু সন্তানের হাতেখড়ির শুরুটা করেন কোচিং দিয়ে। আর এ সুযোগে এদেশের পাড়াতে পাড়াতে গড়ে উঠেছে সাধারণ কোচিং সেন্টারের পাশাপাশি অসংখ্য হাড়েখড়ি প্রি-স্কুল/কোচিং/পাঠদান কেন্দ্র। বাচ্চাকে হাতেখড়ি পাঠদান কেন্দ্রে ভর্তি করে দিয়ে অবশ্য শিক্ষিত মায়েদের বেশ ভালই হয়েছে। যতক্ষণ বাচ্চার পাঠদান কার্যক্রম চলবে ততক্ষণ একটা লম্বা আড্ডা দেয়া যাচ্ছে। না না, আড্ডা মানে কিন্তু কেবল আড্ডাই নয়, বরং এই আড্ডার মধ্য দিয়েই তারা একে অপরের সাথে কথা বলে জানতে পারছে কোন কোন কোচিং সেন্টারগুলো সেরা। কেননা, হাতেখড়ির পরেই তো আবার ছুটতে হবে কোচিং সেন্টারে। এছাড়া যারা ফেসবুক বড়িতে(টেবলেটে) আসক্ত তাদের সময়টাও বেশ ভালই কাটে। একজন শিক্ষিত আদর্শ মায়েরই তো জানার কথা, এলাকায় কোন কোন কোচিং সেন্টার সেরা স্থানে রয়েছে। কেননা, সন্তানকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাইলে যে কোচিং সেন্টারের কোন বিকল্প নেই। কোচিং না করলে সন্তান এ+ পাবে কী করে? আর এ+ না পাওয়া মানেই সব শেষ, কোথাও চান্স নেই। তাই শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের উপর ভরসা না করে বরং কেবল কোচিং নয়, কোচিং এর পাশাপাশি বাসায় গৃহ শিক্ষকও রাখতে হবে। এক্ষেত্রে দেখতে হবে কোন প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে সব থেকে বেশী সংখ্যক ছাত্র/ছাত্রী প্রাইভেট পড়ছে। প্রয়োজন হলে তাকে বেশী টাকা দিয়ে হলেও হায়ার কর। সময় দিতে না পারলে প্রয়োজনে রাত ১২টার পরে পড়াতে বলো। হাজার হোক, সেরা শিক্ষক বলে কথা। সেরা শিক্ষকদের অবশ্য ঘুম-আরাম আয়েশের খুব একটা আবশ্যকতা নেই। কাজেই দিনে সময় না থাকলে তাতে কি, রাতে পড়াবে, তা সন্ধ্যা রাতই হোক, আর ভোর রাতই হোক, রাত তো রাতই। বলাতো যায় না, যদি অল্পের জন্য সন্তানের এ+ টা হাতছাড়া হয়ে যায়।

সত্যিই আমাদের এখন কঠিন সময়। পিতা-মাতার জায়গাটা নিয়েছে শশুড়-শাশুড়ী, বউয়ের জায়গাটা নিয়েছে গার্লফ্রেন্ড, স্বামীর জায়গাটা নিয়েছে বয়ফ্রেন্ড তাহলে বিদ্যালয়ের জায়গাটা কোচিং সেন্টারগুলো দখল করলে ক্ষতি কী? অবশ্য দখল করা বললে ভুল হবে। কেননা, বিদ্যালয়গুলো স্বেচ্ছায় তাদের জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছে কোচিং সেন্টারকে। স্বামী যদি স্বেচ্ছায় বউকে তার বয়ফ্রেন্ড এর কাছে ছেড়ে দেয় তাতে বউয়ের কী? একজন পুরুষইতো, সে স্বামিই হোক আর বয়ফ্রেন্ডই হোক। আর এটা কেবল সেই স্বামীই পারে যে তার বউকে ব্যবসার সামগ্রী মনে করে। আর বর্তমান সময়ে যদি কতগুলো লাভজনক ব্যবসার তালিকা করা হয় তাহলে মনে হয় ১ নম্বরে স্থান পাবে শিক্ষা ব্যবসা। যদি এটাই সত্য হয় তাহলে কীভাবে বিদ্যালয়গুলো শিক্ষাদান ব্যবস্থাকে নিজেদের হেফাজতে রাখবে? তাই তারা নিজেদের জায়গাটা ছেড়েই দিয়েছে। স্বামী যেমন বউকে বয়ফ্রেন্ড এর কাছে যেতে দিয়ে নিজে যায় গার্লফ্রেন্ড এর কাছে বিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও ঠিক তেমনই। নিজেদের জায়গাটা কোচিং সেন্টারকে ছেড়ে দিয়ে তারা নিজেরা গিয়েছে কোচিং সেন্টারের জায়গায়। আর এটা দেখে এদেশের বুদ্ধিজীবিরা উদ্বিগ্ন না হলেও আমার মত গবেটেরা কেবলেই হাহুতাশ করেই চলেছে।

মোঃ আব্দুল হাই খান
পরিচালক
গাইবান্ধা কম্পিউটার এন্ড আইটি এডুকেশন।
E-mail: haikhan2002@gmail.com

কোচিং বন্ধ নিয়ে যা বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাঃ ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

No Comments

    Leave a reply