প্রথম শ্রেণীর চাকুরীর জন্য চতুর্থ শ্রেণীর কোচিং কতটা সহায়ক?

বাংলাদেশে একাডেমিক কোচিং এর পাশাপাশি এখন চাকুরীর কোচিংগুলোও বেশ জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে চাচ্ছে। বিশেষ করে বি.সি.এস এর জন্য কোচিং, ব্যাপারটা সত্যিই অবাক করার মত। কারা চালায় এসব কোচিং সেন্টার? বাংলাদেশের কোন কোচিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা/পরিচালক কোন বি.সি.এস ক্যাডার, এটা ভাবার কোন সুযোগ নেই। কেননা, এতে যেমন রযেছে আইনগত সমস্যা, তেমনি অফিস চলাকালীন সময়ে অফিস বাদ দিয়ে কোচিং এ যাওয়াটা বা কোচিং পরিচালনা করা বা কোচিং এ ক্লাশ নেওয়াটাও স্বাভাবিক নয়। এক কথায় বলতে গেলে, কোচিং সেন্টার তারাই প্রতিষ্ঠা করেন যারা চেষ্টা করেও নিজের জন্য একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রে বি.সি.এস তো দূরের কথা স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেননি এমন ব্যক্তিরা কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে জমজমাট ব্যবসা চালাচেছন।

যিনি চতুর্থ শ্রেণীর একটা চাকুরী নিজের জন্য ব্যবস্থা করতে পারলেন না, তিনি কী করে কোচিং এর মাধ্যমে বি.সি.এস ক্যাডার বানাবেন, এটা আমার বোধগম্য নয়। অনেকেই হয়তো বলবেন, কোচিং করে অনেকেই বি.সি.এস এ চান্স পেয়েছে, প্রকৃতপক্ষে যিনি বি.সি.এস এ চান্স পেয়েছেন তিনি তার নিজ যোগ্যতাতেই পেয়েছেন, কোচিং এর কারণে নয়। বি.সি.এস এর মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবীরাই ক্যাডার হিসেবে চাকুরী পান। যিনি মেধাবী নন, তিনি কোচিং করলেই ক্যাডার হয়ে যাবেন এটা ভাবা অনর্থক। বাংলাদেশে যদি একটিও কোচিং সেন্টার না থাকে তাহলে কি ক্যাডার নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে? নাকি এটাই বলবো যে, কোচিং সেন্টারগুলোই মেধাবী বানাচ্ছেন?

মেধা, জ্ঞান, বুদ্ধি এগুলো এমন একটি বিষয় যা হস্তান্তর বা বিতরণযোগ্য নয়। এটা তৈরী হয় লেখাপড়ার মাধ্যমে ব্যক্তির মস্তিস্কে। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীর অনুর্বর মস্তিস্ককে উর্বর হতে সহায়তা করতো ক্লাশে পাঠদানের মাধ্যমে। কেননা, উর্বর মস্তিস্কেই তৈরী হতে পারে উত্তম মেধা। আর এ কারণেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/শিক্ষককে বলা হয়, “মানুষ গড়ার কারিগর”।

এখন সময়টা বদলে গেছে। এখন আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করেনা। বর্তমান সময়ে অন্যান্য ব্যবসার তুলনায় সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবসা। অতীতে দূর্বল শিক্ষার্থীরা নিজের দূর্বলতাগুলো অতিক্রম করার জন্য স্পেশাল কেয়ার তথা প্রাইভেট বা কোচিং এর সাহায্য নিতো। অর্থাৎ, প্রাইভেট/কোচিং করা মানেই হলো ঐ শিক্ষার্থী ছাত্র/ছাত্রী হিসেবে খুব একটা ভাল নয়। আর যে ভাল ছাত্র/ছাত্রী তার তো প্রাইভেট/কোচিং এ যাওয়ার মত কোন সময়ই নেই। কেননা, একজন ভাল ছাত্র/ছাত্রীর কাছে প্রাইভেট/কোচিং করা মানেই হলো সময় নষ্ট করা। জ্ঞান আহরণ করতে হলে শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের দেখানো পথ অনুসরণ করে একনিষ্ঠভাবে অধ্যায়ন করার কোন বিকল্প নেই।

বর্তমান সময়ে প্রাইভেট/কোচিং একটা কালচারে পরিণত হয়েছে। এখন যে শিক্ষার্থী যত বেশী শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়বে বা কোচিং করবে সে তত ভাল ছাত্র/ছাত্রী। এখন প্রাইভেট/কোচিং ব্যবসার কার্ক্রম চলে রাত্রী ১১টা/১২টা পর্যন্ত। আমি জানিনা, রাত্রী ১১টা/১২টা পর্যন্ত যদি প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ে তাহলে নিজে পড়ে(স্ট্যাডি করে) কখন? আর নিজে যদি নাই পড়ে তাহলে তার মস্তিস্কে মেধা তৈরী হবে কিভাবে তা আমার জানা নেই। বস্তুত: প্রাইভেট কোচিং এর মাধ্যমে শিক্ষক ওঠেপড়ে লাগেন শিক্ষাথীকে পরীক্ষায় পাশ করানো বা পরীক্ষায় ভাল ফল করার কৌশলগুলো শেখানোর জন্য, মেধাবিকাশের তাবিজ দেন না। যদি তাই না হবে, তাহলে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে থেকে ইংরেজী পড়া শুরু হয় চলে মাস্টার্স পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অথচ, মাস্টার্স পাশ করে ইংরেজীতে কথা বলা তো দূরের কথা, শুদ্ধ উচ্চারণে ইংরেজী পড়তে পারেন না এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। শুধু কি তাই, মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহারও শুদ্ধভাবে করতে পারেন না অনেকেই। তাহলে বি.সি.এস এর আগে কয়েক মাস কোচিং করেই একজন ছেলে/মেয়ে মেধাবীতে পরিণত হবে এটা ভাবার আদৌ কোন যৌক্তিকতা আছে কি?

আমি বি.সি.এস কোচিং করছে এমন অনেকের মুখে শুনেছি, কোচিং করলে পড়ার চাপ থাকে। কথায বলে, “সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই স্ব-শিক্ষিত”। অর্থাৎ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করে কিছু জ্ঞান অর্জন আর একটা সনদপত্রের জন্য। আর লেখাপড়া শেষে কর্মজীবনে এসে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতপক্ষে ছাত্র জীবনকে বলা হয় বীজ বপনের সময়। অর্থাৎ ছাত্র জীবনে ছাত্র/ছাত্রীরা জ্ঞানবৃক্ষের বীজ বপন করে নার্সিং করে আর ঐ জ্ঞানবৃক্ষ ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হয় সাধারণ শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ কর্মজীবনে এসে। যেকোন ফলবান বৃক্ষ প্রথমবার যখন ফল দিতে শুরু করে সময়ের সাথে সাথে যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে বৃক্ষ আরও বেশী ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হয়। সুতরাং বলা যায়, একজন শিক্ষার্থী সাধারণ লেখাপড়া শেষে যে জ্ঞানবৃক্ষের মালিক হন তাতে দু’চারটি কলি ব্যতিত তেমন কোন ফুল ও ফল ধরে না। ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ করতে চাইলে তাকে পূর্বের লেখাপড়ার স্টাইল পরিবর্তন করে পর্যাপ্ত পরিমাণে স্ট্যাডি করতে হবে। অন্যথায় ঐ জ্ঞানবৃক্ষ ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হওয়া তো দূরের কথা বরং পর্যায়ক্রমে ঐ জ্ঞানবৃক্ষ শুকনো কাঠ বা মরা বৃক্ষে পরিণত হয়। আমি হলফ করে বলতে পারি জরিপ চালালে দেখা যাবে মাস্টার্স শেষ করার পর সঠিক ভাবে বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজী গ্রামার, গণিত ও জ্যামিতির সঠিক প্রয়োগ করতে পারেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতকরা হারে যা পাওয়া যাবে তা একেবারেই নগন্য। অর্থাৎ অবস্থা এমন যে, আমাদের ছেলে-মেয়েরা এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে ওঠা মানেই পূর্বের শ্রেণীতে অর্জিত জ্ঞান পূর্বের শ্রেণীতেই রেখে যান গুটি কয়েক শিক্ষার্থী ব্যতিত প্রায় সকলেই। মাস্টার্স পাশ করার পর যেকোন ব্যক্তির পক্ষে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রচলিত যেকোন বিষয় পড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করার কথা অথচ যে বিষয় নিয়ে সে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন অনেকের সে বিষয়েও খুব একটা দখল থাকেনা।

বস্তুত: শিক্ষার্থীরা ছাত্র জীবনে যে জ্ঞানবৃক্ষের বীজ বপন করে তা নার্সিং করতে করতে তাদের গতানুগতিক লেখাপড়া শেষ হয়ে গেলেও জ্ঞানবৃক্ষটা চারাতেই থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে তারা ছুটাছুটি করে কিভাবে কোথায় কোচিং প্রাইভেট পড়ে বা টাকা পয়সা দিয়ে একটা চাকুরী যোগাড় করে নেয়া যায়। ছাত্র জীবনে যার জ্ঞানবৃক্ষটা পরিণত বৃক্ষে রুপান্তরিত হতে পারেনি কয়েক মাসের কোচিং নিয়ে কী করে সে একটা ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ বৃক্ষ আশা করতে পারে? অবশেষে চলে টাকার প্রতিযোগিতা। যেকোন মূল্যে যত টাকাই লাগুক একটা চাকুরী তাকে যোগার করতেই হবে। আর টাকার বিনিময়ে চাকুরী নিয়ে তিনি দেশ ও দশের জন্য কল্যাণ নামক ফল সরবরাহ করবেন এটা ভাবা অমুলক।

ছাত্র জীবন শেষ করেও যিনি কোচিং প্রাইভেট পড়ে চাকুরী পাওয়ার কথা ভাবেন বা টাকার বিনিময়ে একটা চাকুরী যোগাড় করার কথা ভাবেন তার জ্ঞানবৃক্ষটা তখনও জীবন্ত আছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐ জ্ঞানবৃক্ষটা একটা বন্ধ্যা বৃক্ষ ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ওটার নেই। অন্যদিকে যিনি কোন কর্মের সংস্থানই করতে না পেরে হতাশ জীবন যাপন করছেন তার জ্ঞানবৃক্ষটা মরেই গেছে অর্থাৎ শুকনো কাঠে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেই শিক্ষার্থীর জ্ঞানবৃক্ষটাই ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ যিনি লেখাপড়া শেষ করে কখনো মনে করেন না তার লেখাপড়া শেষ। অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানীদের ছাত্র জীবন শেষ হলেও লেখাপড়া শেষ হয় না। ছাত্র জীবনে যে জ্ঞানবৃক্ষের বীজ বপন করে শিক্ষকের সহায়তায় নার্সিং করে জ্ঞানবৃক্ষে রুপান্তর করেছেন, ছাত্র জীবন শেষে আরও বেশী বেশী নার্সিং করে ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ জ্ঞানবৃক্ষে পরিণত হতে পারে। কেননা, একজন শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে প্রথমে শিক্ষিত হবে, তারপর আরও বেশী বেশী অধ্যায়ন করে সুশিক্ষিত হবে। আর প্রাইভেট কোচিং এর মাধ্যমে কখনোই সুশিক্ষিত হওয়া যায় না, সুশিক্ষিত হতে হয় নিজে নিজে চেষ্টা করে। প্রসঙ্গত বলতে হয়, লেখাপড়া হলো একটা নির্দিষ্ট সিলেবাসের আওতায় কতগুলি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নোত্তর শিখে পরীক্ষায় লিখে দিয়ে পাশ করা, আর অধ্যায়ন করা হলো কোন একটা অজানা বিষয় সম্পর্কে মনোযোগ সহকারে পড়ে তার ভিতরে প্রবেশ করতে চেষ্টা করা। আমাদের দেশের বেশীর ভাগ শিক্ষার্থী সারাজীবন লেখাপড়াই করে, অধ্যায়ন করা যেন এরা বোঝেই না। প্রাইভেট কোচিং এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী লেখাপড়া করা যায়, জ্ঞান আহরণের জন্য অধ্যায়ন করা যায় না। সুতরাং ছাত্র জীবন শেষ করেও যিনি প্রাইভেট কোচিং এর মায়া ত্যাগ করতে পারেছেন না, ক্যাডার হিসেবে চাকুরী পাওয়ার স্বপ্ন না দেখে বরং পুনরায় স্কুল জীবন শুরু করাটাই তার জন্য উত্তম পন্থা।

মোঃ আব্দুল হাই খান
পরিচালক
গাইবান্ধা কম্পিউটার এন্ড আইটি এডুকেশন।
E-mail: haikhan2002@gmail.com

 

No Comments

    Leave a reply