আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও একটি প্রস্তাবনা

আমার এ লেখাটি আমি তিনটি ধাপে উপস্থাপন করতে চাই। প্রথম ধাপে- শিক্ষার্থীরা কেন কোচিং করতে আগ্রহী হয়? সে বিষয়ে যৌক্তিক আলোচনা, দ্বিতীয় ধাপে- আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার দূর্বলতা নিয়ে আলোচনা, তৃতীয় ধাপে- শিক্ষা ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা।

শিক্ষার্থীরা কেন কোচিং করতে আগ্রহী হয়?

বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিগত কয়েক দশকে যত দ্রত গতিতে পাশের হার বেড়েছে তার থেকেও অনেক দ্রুত গতিতে এদেশে মেধা বিকাশের হার কমে গিয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুরোটাই এখন জিপিএ ৫ কিংবা পাশ নির্ভর, মেধা নির্ভর নয়। আর এটা এ দেশের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবিরাও বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করছেন। এদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি তে জিপিএ ৫ নিয়ে পাশ করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ হাজারের উপর শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা দিযে ইংরেজীতে পাশ করে মাত্র দু’জন এমন নজিরও আছে। অথচ, শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজীকেও বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হয়। আর আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজী শেখার ভিত্তি এতটাই মজবুত যে, এস.এস.সি, এইচ.এস.সি, স্নাতক কিংবা অনেকে ক্ষেত্রে মাস্টার্স সম্পন্ন করা কোন ব্যক্তিকে যদি বলা হয়, “রহিম বাড়ী যায়, এর ইংরেজী কী হবে?” আমার অভিজ্ঞতা বলে, উত্তরে খুব অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী ছাড়া বেশীর ভাগ শিক্ষার্থীই বলবে, “Rahim go home.”। সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, মেধা যাচাইয়ের প্রকৃত মাপকাঠিটা আসলে কী?

আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষার্থী যে বিষয় নিয়েই তার শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করুক না কেন, অন্ততপক্ষে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পঠিত বিষয়ের জ্ঞানগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে সে সক্ষম হবেই কেননা, এটাই মেধার মূল ভিত্তি। আর তাছাড়া, এই সময়ে অর্জিত জ্ঞানের বেশীর ভাগটাই তার দৈনন্দিন জীবনে চলতে ফিরতে প্রয়োজন হয়। যেমন- ৫০০ টাকা দু’জনকে ভাগ করে দিলে একেক জন কত টাকা পাবে এটা বের করার জন্য যদি কাউকে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে হয়, তবে অন্যরা যে যাই বলুক না কেন, অন্তত: আমি তাকে শিক্ষিত বলতে রাজী নই। ছাত্র/ছাত্রী পড়াতে গিয়ে আমি প্রায়শই লক্ষ্য করি, ৫০০ তো দূরের কথা, শিক্ষার্থীরা ৫ কে ২ দিয়ে ভাগ করতে হলেও আজকাল ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছে।

আজকাল অনেকেই কোচিং নিয়ে নানা কথা বলছেন। একথা সত্যি যে, কোচিং মানেই শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করার একটি অভিনব উপায়, এটা মেধা বিকাশে সহায়ক নয় (হলে হয়তো ভালই হতো)। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন শিক্ষার্থীরা কোচিং করতে আগ্রহী হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক সহ সকলেই এক বাক্যে উত্তর দেবেন, স্কুল/কলেজে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে এবং স্বল্প সময়ে সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হয় না, তাই কোচিং এর প্রয়োজন। অর্থাৎ কোচিং সম্পর্কে যে যাই মতামত দিন না কেন, এখানে দু’টো কমন বিষয় পাওয়া যাবে, ১. অনেক শিক্ষার্থী ২. স্বল্প সময়ে সিলেবাস সম্পন্ন হয় না। আর কেউবা হয়তো বলবেন, দূর্বল শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ক্লাসে বুঝতে পারেনা, তাই তাদের জন্য কোচিং বেশ সহায়ক। কিন্তু আমি যতদূর জানি, অনেক কোচিং সেন্টার ভর্তি করানোর আগে শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করে দেখেন। শিক্ষার্থী খুব দূর্বল হলে পারতপক্ষে উক্ত শিক্ষার্থীকে তারা কোচিং এ ভর্তি নেন না। কেননা, ভাল শিক্ষার্থী মানেই ভাল ফলাফল, আর ভাল ফলাফল মানেই কোচিং সেন্টারের সাফল্য এবং পরের বছর আরো অধিক শিক্ষার্থী পাওয়ার জন্য সহায়ক।

আমার বিশ্বাস, যদি উল্লেখিত দু’টো কারণেই শিক্ষার্থীরা কোচিং করতে আগ্রহী হয়, তাহলে উক্ত কারণের সঠিক সমাধান বের করা খুব একটা কঠিন হবে না। কোচিং সেন্টার নিয়ে মাতামাতি না করে বরং শিক্ষার্থীরা যাতে কোচিং করার প্রয়োজনই মনে না করে এমনকি কোচিং এ যাওয়ার সময়ই না পায়, বিদ্যালয়ে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই বরং তা অধিকতর বাস্তব সম্মত হবে।

প্রকৃত মেধাবিকাশে প্রতিবন্ধকতা ভেবে কোচিং সেন্টার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই বরং শিক্ষার্থীকে কিভাবে কোচিং বিমূখ করা যায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর এ ধরণের উদ্যোগ নিতে গেলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে, এদেশে কেন এবং কত প্রকারের কোচিং সেন্টার চালু আছে? আমার জানামতে নিম্নোক্ত কয়েক ধরণের কোচিং সেন্টার এদেশে চালু আছে।

১. একাডেমিক কোচিং

২. পাবলকি পরীক্ষার প্রস্তুতি কোচিং

৩. স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং

৪. চাকুরীর কোচিং

৫. ভাষা শিক্ষাদান তথা স্পোকেন শিক্ষা কোচিং।

১. একাডেমিক কোচিং:

এ ধরণের কোচিং চলে সারা বছর ধরে। এ জাতীয় কোচিং সেন্টারগুলোর মধ্যে যেগুলো ইতোমধ্যে মার্কেট দখল করতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলো প্রতিবছর ডিসেম্বর মাস এলেই স্কুল/কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মাইকিং করে ভর্তি ফরম বিতরণ করে থাকে এবং ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে শিক্ষার্থী ভর্তি করান সারা বছরের জন্য। এসব কোচিং সেন্টার কেবলমাত্র কোচিং ফি নয় বরং মোটাদাগে একটা ভর্তি ফিও নিয়ে থাকে। এসব কোচিং সেন্টারে ডিসেম্বর মাসে কোন ক্লাস না হলেও শিক্ষার্থীকে কিন্তু জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসেরই ফি পরিশোধ করতে হয়।

২. পাবলকি পরীক্ষার প্রস্তুতি কোচিং:

এটা হলো মৌসুমী কোচিং এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে বোকা বানিয়ে অর্থ উপার্জনের একটি অভিনব কৌশল। এ ধরণের কোচিং শুরু হয় পাবলিক পরীক্ষা শুরুর ২/৩ মাস পূর্বে মানে যখন একজন পরীক্ষার্থীর মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখা জরুরী, ঠিক সেই সময় জিপিএ ৫ পাইযে দেয়ার লোভ দেখিয়ে প্রতিনিয়ত মডেল পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীকে ব্যস্ত রাখা এবং শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করা হয়। কোন শিক্ষার্থী যদি গোটা বছর ধরে প্রকৃতপক্ষেই লেখাপড়া করে থাকে তাহলে এসব মডেল টেস্ট তার জন্য কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না। এ ধরণের কোচিং এর মধ্যে রয়েছে, জে.এস.সি প্রস্তুতি কোচিং, এস.এস.সি প্রস্তুতি কোচিং, এইচ.এস.সি প্রস্তুতি কোচিং ইত্যাদি। এসব কোচিং এ শিক্ষার্থীরা প্রতি বিষয়ে গড়পরতা ৪/৫টি ক্লাস/পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কিভাবে নিজেকে পাবলিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন তা আমার জানা নেই।

৩. স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং:

এই কোচিং শুরু হয় বিশেষ করে এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর মেডিকেল/ইঞ্জিনিয়ারিং/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার প্রস্তুতি স্বরূপ। এর পাশাপাশি আছে ক্যাডেট ভর্তি কোচিং(সারা বছর ধরে চলে)। এমনকি এখন প্লে তে ভর্তির প্রস্তুতির জন্যও অনেক এলাকায়(যেমন- গাইবান্ধায় আছে) ভর্তি কোচিং চালু করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, অনেক ডিগ্রীধারী শিক্ষিত পিতা-মাতাও স্বাচ্ছন্দ্যে এসব কোচিং সেন্টারে সন্তানকে দিচ্ছেন অ, আ, ক, খ, ১, ২, ৩ শেখানোর জন্য। এটা দেখে মনে হয় বিখ্যাত দার্শনিক/সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট যে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে ভাল(শিক্ষিত) মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটা মহৎ জাতি উপহার দিব”(“Give me good mothers and I shall give you a great nation!”) এটি ছিল একটি নিছক কল্পনা মাত্র। বলা হয়ে থাকে, শিশুর প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন তার পিতা-মাতা, কিন্তু অ, আ, ক, খ, ১, ২, ৩ শেখানোর জন্য যদি পিতা-মাতা তার সন্তানকে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করান তাহলে পিতা-মাতাই শিশুর প্রথম শিক্ষক এটা বলা কি আদৌ বাস্তব সম্মত? উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে অর্থাৎ বিগত ১২/১৪ বছর ধরে (প্লে+নার্সারী+১-১২) লেখাপড়া করে যে শিক্ষার্থী মেধাবী হয়ে উঠতে পারেনি, মাত্র কয়েক মাস কোচিং করে কী করে একজন শিক্ষার্থী মেডিকেল/ইঞ্জিনিয়ারিং/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করবে তা আমার বোধগম্য নয়। অথচ এইচ.সি.পরীক্ষার পর যে অবসর সময়টুকু পাওয়া যায় তা যদি একজন শিক্ষার্থী ঘরে বসেই কাজে লাগায় তাহলে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বাসায় ইন্টারনেট সংযোগসহ একটি কম্পিউটার থাকলে সে নিজে থেকে যা আহরণ করতে পারবে, সে তুলনায় কোচিং সেন্টার থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান কিছুই না।

৪. চাকুরীর কোচিং:

এখন বলতে গেলে প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগ, ব্যাংকিং জব, বি.সি.এস সহ সব ধরণের চাকুরীর জন্যই আমাদের দেশে কোচিং চলছে বেশ জমজমাট ভাবেই। যেখানে বি.সি.এস হচ্ছে বাংলাদেশের সরকারী চাকুরী প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ধাপ, সেখানে এই ধাপ অতিক্রমে সহায়তা নেয়ার জন্য একজন চাকুরী প্রার্থী যাচ্ছেন তাদের কাছে যারা নিজেরাই একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন। এত বছর লেখাপড়া করে যে কিনা মেধাবী হতে পারেনি, সে যদি কয়েক মাস কোচিং করেই বি.সি.এস দিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চাকুরীটি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, মন্দ কী?

৫. ভাষা শিক্ষাদান তথা স্পোকেন শিক্ষা কোচিং।

এসব কোচিং এ সাধারণত বিদেশী ভাষায় কথা বলা, লিখন, পঠন শেখানো হয়। এগুলোর মধ্যে ইংলিশ স্পোকেন কোচিং, এ্যারাবিক স্পোকেন কোচিং, জাপানী/কোরিয়ান/চাইনিজ স্পোকেন কোচিং ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যেহেতু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশী ভাষা শেখানোর তেমন কোন উদ্যোগ নেই, কাজেই যারা শিক্ষা জীবন শেষে বিদেশে গিয়ে চাকুরী করতে চান, তাদের জন্য এসব কোচিং কিছুটা সহায়ক হলেও হতে পারে।

উল্লেখিত কোচিং গুলোর মধ্যে ১-৪ নং পর্যন্ত কোচিং একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যদি বিদ্যালয় সত্যিকার অর্থেই শিক্ষার্থীর মেধাবিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়, তাহলে একজন শিক্ষার্থী কখনোই একাডেমিক কোচিং করতে আগ্রহী হবে না। অন্যদিকে বিদ্যালয় যদি সারা বছর ধরে মেধাবিকাশের সাথে সাথে শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুত করে, তাহলে একজন শিক্ষার্থী কখনোই পাবলিক পরীক্ষার আগে রিলাক্স না থেকে প্রস্তুতি কোচিং করার নামে নিজের ব্রেনকে উত্তপ্ত করতে যবে না। বিদ্যালয় যদি মেধাবিকাশের উত্তম ক্ষেত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তাহলে অন্যসব কোচিং স্বাভাবিক ভাবেই অনর্থক হয়ে পড়বে।

বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধতে পারলে ইঁদুররা হয়তো বেঁচে যাবে, কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধার কাজটা যে সহজ নয় সেটা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু কোন মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গেলে যে কাউকে না কাউকে ঝুঁকি নিতেই হবে। এ দেশটা স্বাধীন করার জন্য যারা নিজের জীবনটা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে তারা কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করছে না বরং স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করছে পরবর্তী প্রজন্ম। যুগে যুগে এটাই হয়ে এসেছে, আসছে এবং এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে, এটা হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করছি। কিন্তু কী উপায়ে শিক্ষার মাঝে একটা আমুল পরিবর্তন আনা সম্ভব সেটাই ভাববার বিষয়।

আমার এ লেখাটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে একটা আমুল পরির্তনের প্রস্তাব উত্থাপন এবং তা বাস্তবায়নের নিমিত্তে নিজের ভাবনাগুলো উপস্থাপন করা। আমি জানি, আমার উপস্থাপিত বিষয়গুলো হয়তো সমাজের অনেক বুদ্ধিজীবিই হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেবেন। পাশাপাশি এটাও বিশ্বাস করি, বিশ্বে এ যাবৎ যত বড় বড় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, শুরুতে সেগুলি সবই ছিল হাস্যকর। “আপেল বোটা খসে উপরে না গিয়ে নিচে পড়ে কেন” নিউটনের এমন প্রশ্ন ছিল হাস্যকর। চার্লজ ব্যাবেজ এর গাণিতিক যুক্তি প্রথমে হাস্যকর মনে হলেও ৪০০ বছর পর ঠিকই তা বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। “গোটা বিশ্ব একদিন গ্রামে পরিণত হবে”, মার্শাল ম্যাকলুহান এর এই উক্তিটিও প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব বহন করেনি। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব যে হাতের মুঠোয় এসেছে এটা বলতে এখন আর কারো দ্বিধা নেই। হাস্যরস তথা মজা করার জন্য ফেসবুক তৈরী হলেও গোটা বিশ্ব এখন ফেসবুক জ্বরে আক্রান্ত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হবে এটিও ছিল সেময় হাস্যকর বিষয়। সর্বশেষ, বাংলাদেশে নিজ অর্থায়নে পদ্মা নদীর বুকে সেতু তৈরী হবে, এটিও ছিল একটি হাস্যকর বিষয় যার বাস্তব পরিণতি এখন দৃশ্যমান। এমনি হাজারো হাস্যকর বিষয় যুগে যুগে পৃথিবীটাকেই বদলে দিয়েছে, দিচ্ছে। তাহলে মান্দাতা আমলের বেকার সৃষ্টির অকেজো শিক্ষা ব্যবস্থাটা বদলানো যাবে না, এটা ভাবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি?

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার দূর্বলতা সমূহ:

আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষার্থী তার গোটা শিক্ষাজীবনে যা কিছু অধ্যায়ন করে তার সবকিছু পরবর্তী জীবনে মনে রাখতে পারেনা, মনে রাখা সম্ভবও না, মনে রাখার প্রয়োজনও নেই। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হলো অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি। যে শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাজীবন শেষে পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খেয়ে নিতে সহযোহিতা না করে তবে সে শিক্ষা কোন স্বার্থক শিক্ষা হতে পারে না। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর অভিযোজন ক্ষমতা খুব একটা বৃদ্ধি পায় না। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুরোটাই সাটিফিকেট নির্ভর। এখানে পাঠদান ও পরীক্ষা গ্রহণ এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে শেখানো হয়, কিভাবে একটা ভাল রেজাল্ট তথা এ+ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। কেননা, ভাল রেজাল্ট মানেই ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ভাল রেজাল্ট মানেই একটা ভাল চাকুরী, ভাল রেজাল্ট মানেই জীবনটা সুখোময়। আর তাই অভিভাবক, বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টার সকলেরই একটাই লক্ষ্য, যে করেই হোক, শিক্ষার্থীর একটা এ+ সনদপত্র চাইই চাই। অথচ যে সকল প্রশ্নের উত্তর লিখে একজন শিক্ষার্থী এ+ সাটিফিকেট অর্জন করে, এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উঠেই তার ৫০% এবং লেখাপড়া শেষ করে বাকী ৫০% অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী লেখাপড়া শেষ হওয়ামাত্রই তার অর্জিত সকল জ্ঞান (যদিও জ্ঞান নয় বরং মুখস্থ করা প্রশ্নের উত্তর) হারিয়ে ফেলে। তাহলে গুটিকয়েক প্রশ্নের উত্তর লিখে এ+ পাওয়া সার্টিফিকেট কী করে মেধা ‍মূল্যায়নের মাপকাঠি হতে পারে? আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণযোগ্য যুক্তিগুলো হলো-

১. বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় লেখাপড়ার শুরু থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজী আবশ্যিক বিষয় হলেও আমাদের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীই লেখাপড়া শেষ করে এসে ইংরেজীতে তো দূরে থাক, মাতৃভাষা বাংলাতেও শুদ্ধভাবে লিখতে পড়তে পারে না। বাংলায় কিছু লিখতে গেলে হয় সাধু-চলিতের পার্থক্য করতে পারেন না, নয় মুখস্থ করা ণ্বত্ব বিধান আর ষত্ব বিধানের নিয়ম মনে না থাকায় বানানে কোথায় স আর কোথায় ষ হবে তা গুলিয়ে ফেলেন। আর বিরাম চিহ্ন কিংবা ইংরেজীর ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল লেটার, স্মল লেটারের ব্যবহারের কথা তো বলাই বাহুল্য। আমার বক্তব্যের সত্যতা আরো জোড়ালোভাবে প্রমাণিত হবে যদি কোন কম্পিউটার কম্পোজ এর দোকানে গিয়ে স্কুল/কলেজের শিক্ষকদের হাতে লেখা প্রশ্নপত্রটি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। যদি কম্পিউটার অপারেটর দক্ষ হন তবে তার কল্যাণে প্রশ্নপত্রটি কিছুটা নির্ভুল হয়। অন্যথায় ছাপানোর পরও প্রশ্নপত্রে অসংখ্য ভুল পরিলক্ষিত হয় বিশেষ করে বিরাম চিহ্ন, সাধুচলিত কিংবা ইংরেজীর ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল-স্মল লেটারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে। আমি বিগত ১৯ বছরে যতগুলো শিক্ষার্থীর ভর্তি ফরম পূরণ করে নিয়েছি তাদের মধ্যে নিজের নাম লিখতে ক্যাপিটেল লেটার ও স্মল লেটারের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। আরো মজার কথা, নিজের নামের বানানের ক্ষেত্রে বাংলা বানানের সাথে ইংরেজী বানানের কোন মিল নেই কিংবা অনেকেই হয়তো নামাটাই সঠিকভাবে লিখতে পারেনি।

২. বাবা-মা উভয়ে শিক্ষিত হলেও এমনকি শিক্ষক হলেও নিজের সন্তানকে কোচিং এবং প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়তে দেন। কারণ তারা ভাল করেই জানেন, সন্তানের লেখাপড়া দেখতে হলে তাদেরকে পুনরায় বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে নচেৎ কোমর বেধে বাড়ীতে বসে প্রতিদিন স্ট্যাডি করতে হবে। তা না হলে তারা সন্তানকে অংক শেখাতে পারবেন না, বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজী ব্যাকরণ পড়াতে পারবেন না, কেননা, ঠিক কত বছর আগে তারা বিদ্যালয় ত্যাগ করেছেন সেটাই তাদের মনে নেই, অংক, গ্রামার এগুলো তো মনে থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। শিক্ষক হলেও তিনি ভয় পান, কারণ যে বিষয়ে তিনি স্কুল/কলেজে পাঠদান করেন সেটাতেই ভাল দখল নেই তার উপর আবার অন্যান্য বিষয়, বাপরে বাপ!

৩. আজকালকার পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু বেশীই ভাবেন, তবে সেটা সন্তানকে মেধাবী করার জন্য নয় বরং যেকোন প্রকারে একটা এ+ সন্তানকে পেতেই হবে। আর এ কারণেই পিতা-মাতা কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের উপর নির্ভর করতে চাননা। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এমনকি কখনো কখনো বিদ্যালয়ের ক্লাস বাদ দিয়ে হলেও সন্তানকে কোচিং এ দিতে হবে। আর যাদের উপার্জনের পরিমাণটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশীই তারা কোচিং ছাড়াও অন্তত আরও ২/৩ জন বা তারও বেশী প্রাইভেট শিক্ষকের চাহিদা অনুভব করেন। রাত্রী ১১টা পর্যন্ত কোন শিক্ষক শিক্ষর্থীর বাসায় প্রাইভেট পড়ান এটা এখন অবাক হওয়ার মত কোন বিষয় নয়। বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে বাড়ীতে এসেই একটু পরেই দৌড় দেয় কোচিং এর উদ্দেশ্যে। কোচিং থেকে আসতে না আসতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। এরপর বাসায় এসে একের পর এক প্রাইভেট শিক্ষক আসে, চলে রাত্রী ১১টা পর্যন্ত। খেলাধূলা তো দূরের কথা, শিক্ষার্থী নিজে কখন পড়ে সেটাই তো হিসেবে মিলেনা। এখনতো আবার অনেক কোচিং সেন্টারই চালু থাকে রাত্রী ৯টা/১০টা পর্যন্ত। সুতরাং এটাই সত্য যে এখনকার শিক্ষার্থীরা পড়ে না বরং তাদেরকে পড়ানো হয় কেবলমাত্র একটা এ+ পাওয়ার জন্য।

৪. শারীরিক এবং মানসিক গঠনের জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলা করাটাও শিক্ষার্থীর জন্য জরুরী। অথচ বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়, কোচিং আর প্রাইভেট নিয়েই ব্যস্ত থাকে ফলে যথেষ্ট ঘুমেরই তারা সুযোগ পায় না, খেলাধূলা করবে কখন? আর পড়া এবং স্ট্যাডি করা, এ দু’টো শব্দের পার্থক্যই তো শিক্ষার্থীরা বোঝেনা, কাজেই তারা স্ট্যাডি করবে কী? অথচ কেবলমাত্র পড়তে পারলেই মেধাবী হওয়া যায় না, মেধাবী হতে হলে প্রচুর স্ট্যাডি করা একান্ত আবশ্যক। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে এ+ পাওয়ার জন্য স্ট্যাডি করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এটা আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারগুলোও বেশ ভালই জানেন। তাই শিক্ষার্থীকে স্ট্যাডি করার সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এর পরিবর্তে বরং শিক্ষার্থীকে কোচিং এর পাশাপাশি ৩/৪টি প্রাইভেট শিক্ষক দেয়াই অধিকতর উত্তম।

৫. বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি রুটিন নির্ভর। স্কুল/কলেজে পাঠদানের জন্য রুটিন বানানো হয় যাতে প্রতিটি ক্লাসের জন্য বরাদ্দ করা হয় ৪০/৪৫ মিনিট। আর শিক্ষকরা ক্লাসে যান বেল পড়ার ১০ মিনিট পর এবং বের হন বেল পড়ার ১০ মিনিট পূর্বে। অর্থাৎ ক্লাসের সময়কাল দাঁড়ায় ২০/২৫ মিনিট। সব শিক্ষকের মাঝে না হলেও অনেক শিক্ষকের মাঝেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে কলেজের কোন শিক্ষক এর ক্লাস যদি রুটিন অনুযায়ী দুপুরের পরে হয় তাহলে তো দুপুরের পূর্বে ঐ শিক্ষককে কলেজে দেখতে পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। আর বাস্তবতা হলো, রুটিন থাকলেও বেশীর ভাগ কলেজেই দুপুরের পরের ক্লাসগুলো আর শেষ পর্যন্ত হয় না। শিক্ষকরা অবশ্য শিক্ষার্থীরা থাকে না, এই অযুহাত দিয়েই পগাড় পার। তাই বলে এটা ভাবার কোন কারণ নাই যে, শিক্ষার্থীরা বাড়ীতে গিয়ে ঘুমাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীরা দুপুরের পরে কলেজের ক্লাস করার থেকে কোচিং এর ক্লাসটাই অধিকতর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। অন্যদিকে শিক্ষকরাও বিকালটা বাড়তি আয়ের জন্য কাজে লাগাতে পারেন।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এখনকার শিক্ষা মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়েছে। মেধাবিকাশের পরিবর্তে এখনকার শিক্ষায় প্রাধান্য পাচ্ছে এ+ এ+ এবং এ+। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই যেন সকল পরীক্ষায় এ+ পাওয়া। তাই জাতিকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকদের ভিতর থেকে এ+ নামক ম্যানিয়াটা আগে দূরীভূত করা। অন্যথায় শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও সমাজে যে অবক্ষয় ঢুকে পড়েছে তা থেকে বের হওয়া সত্যিই অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আমার প্রস্তাবনা:

সেদিন আর বেশী দূরে নেই, যেদিন আমাদের এই ছোট্ট বাংলাদেশটাও বিশ্বের অন্য দশটি উন্নত দেশের ন্যায় একই সারিতে অবস্থান করবে। সুতরাং আগামীর উন্নত বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও হবে উন্নত, যা কোচিং বা প্রাইভেট নির্ভর হবে না। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক হবে মানুষ গড়ার কারিগর। সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা নয় বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে শিক্ষার্থীর মেধাবিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পাঠ্যপুস্তকে খুব একটা পরিবর্তন প্রয়োজন না হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে একটা ব্যাপক পরিবর্তন আনয়ন খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। কিভাবে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব সে ব্যাপারে আমার প্রস্তাবনা হলো-

১. যেহেতু বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা এখন সকাল থেকে সারাদিন এমনকি রাত্রী অবদি স্কুল/কলেজ, কোচিং, প্রাইভেট নিয়েই ব্যস্ত থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, আরাম-আয়েশ, খেলাধূলা কিংবা স্ট্যাডি নিয়ে ব্যস্ত থাকে না, কাজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের সময়সীমা পরিবর্তন করে কমপক্ষে ১২ ঘন্টা অর্থাৎ সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত করা যেতে পারে। অবশ্য কেবলমাত্র বিদ্যালয়ে পাঠদানের সময়সীমা বৃদ্ধি করলেই চলবে না, বরং বিদ্যালয়ে কর্মরত একজন শিক্ষক/কর্মচারী মাস শেষে যে বেতন পান তা দিয়ে সম্মানের সাথে জীবন জীবিকা নির্বাহ করা যায় কি না, সেটাও ভেবে দেখতে হবে।

২. সকল শিক্ষক/কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর জন্য মধাহ্নভোজের ব্যবস্থা বিদ্যালয়েই করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র পাঠদান করা নয় বরং নিয়মিত খেলাধূলার সুযোগ থাকা আবশ্যক। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সাধারণ পাঠদান; এরপর মধ্যাহ্নভোজ, ১ ঘন্টা বিনোদন ও খেলাধূলার জন্য বরাদ্দ। বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সৃজনশীল গুণাবলী বিকশিত করা, ব্যাক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো, অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র গঠনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ তথা শিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৩. পাঠদানে সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও পরীক্ষা সিলেবাস নির্ভর হওয়া উচিৎ নয়। পরীক্ষার ফলাফল বিভিন্ন গ্রেডে প্রকাশ করা হলেও সকল স্তরের শিক্ষার্থীর পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ নিজ নিজ স্তরে অভিযোজন ক্ষমতা মূল্যায়ন। পাঠ্য বই এর গতানুগতিক কতকগুলি প্রশ্নের উত্তর লিখে দিয়ে এ+ প্রাপ্তি নয় বরং নিজ নিজ স্তরে অভিযোজন ক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমেই বিভিন্ন গ্রেড প্রদান করা যেতে পারে। পাঠ্য পুস্তকে যাই পড়ানো হোকনা কেন, প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সকল পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হবে অভিযোজন ক্ষমতা মূল্যায়ন।

৪. মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রাপ্ত গ্রেডকে প্রাধান্য দেয়ার কোন কারণ নেই। উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর সকল শিক্ষার্থীর জন্য যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আবেদন করার সুযোগ থাকবে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অভিযোজন ক্ষমতা মূল্যায়ন করে অধিকতর মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই করে ভর্তির ব্যবস্থা করবে। এর ফলে কোচিং যেমন অনর্থক একই সাথে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই তার নিজ নিজ যোগ্যতা মূল্যায়ন করেই ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে সক্ষম হবে।

৫. ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হলে যেহেতু কেবলমাত্র ব্যক্তিত্ব বিকশিত হলেই চলবে না বরং ‍বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানটাও অত্যাবশ্যক কাজেই উচ্চ শিক্ষা স্তরে বর্তমানে প্রচলিত একাডেমিক পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন না করলেও চলবে। তবে চাকুরীর ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেয়াটা একেবারেই অবান্তর। যে বিষয়ে বা যে উদ্দেশ্যে লোক নিয়োগ করা হবে সেই বিষয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি অভিযোজন ক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমেই যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন করা যেতে পারে। এর ফলে কেবল শিক্ষা ক্ষেত্রের অসঙ্গতিই দূরীভূত হবে না, বরং নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানও তাদের চাহিদা মাফিক যোগ্য কর্মী বেছে নিতে পারবেন। সকল পরীক্ষায় ভাল ফলাফল মানেই তিনি একজন ভাল কর্মী হবেন বাস্তবে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায় না।

৬. উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকুরী প্রাপ্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যদি পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল কোন প্রভাবই না ফেলে তাহলে কোন শিক্ষার্থী এ+ প্রাপ্তির আশায় ছুটাছুটি করবে এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। অন্যদিকে যে শিক্ষার্থীর অভিযোজন ক্ষমতা যত বেশী উন্নত হবে সে তত ভাল অবস্থানে যাবে এজন্য শিক্ষার্থীরা এ+ প্রাপ্তির থেকে অভিযোজন ক্ষমতা বিকশিত করাকেই অধিক প্রাধান্য দেবে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার সকল স্তরে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল গুণাবলী বিকশিত করা, ব্যাক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো, অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র গঠনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

৭. শিক্ষার উদ্দেশ্য যে ভবিষ্যতে একটা ভাল চাকুরী পাওয়া নয় বরং ব্যক্তিত্ব গঠন ও অভিযোজন ক্ষমতা বিকশিত করা এটা শিক্ষার্থীদের ভিতরে গেঁথে দিতে হবে। অর্থ উপার্জনের জন্য পেশা যাই হোকনা কেন, সকল পেশাই সম্মানের। আমাদের মনে রাখতে হবে কোন দেশের শতভাগ লোক শিক্ষিত হওয়া মানে সেই দেশের লোকেরা রাস্তা/ড্রেন পরিষ্কার করে না, মাঠে-ঘাটে কাজ করে না তা কিন্তু নয়। বরং একটি উন্নত ও শিক্ষিত জাতির সব ধরণের কাজেই পড়বে শিক্ষার ছাপ এটাই কাম্য।

৮. উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পর সকল শিক্ষাই হবে কর্মমূখী শিক্ষা। কাজেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাই বাছাই করে দেবে কে কোন বিষয়ে বাকী লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধির অর্থই হচ্ছে প্রত্যেকেই লেখাপড়া শেষ করে যার যার অবস্থান থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য একটা কর্ম বেছে নেবে, বছরের পর বছর বেকার জীবন যাপন করা নয়। আর লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে হলেও একটা চাকুরীই তাকে যোগাড় করতে হবে এমন চিন্তা তো মাথায় আসার কোন প্রশ্নই আসে না।

৯. বিশ্বের অনেক দেশেই ৮/৯ বছরের একটি শিশুও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করতে পারে যদি উক্ত শিশুর অভিযোজন ক্ষমতা গ্রাজুয়েট পর্যায়ের হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলাফল কিংবা সার্টিফিকেট কোনটাই প্রয়োজন হয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডাক্তারদের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করার জন্য পাঠ্য বিষয়ে পঠিত জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগ প্রয়োজন হলেও অন্যসব ক্ষেত্রে পাঠ্য বইয়ের পঠিত জ্ঞানের থেকেও অধিকতর গুরুত্ব বহন করে অভিযোজন ক্ষমতা। তবে একথাও সত্য যে পাঠ্য বই অধ্যায়নের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর মাঝে সেই অভিযোজন ক্ষমতাটা বৃদ্ধি পায়।

১০. একজন ম্যাজিস্ট্রেট এর ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে না প্রয়োজন পড়ে বাংলা সাহিত্যের বিলাসীর চরিত্র বিশ্লেষণ করা, না বীজগণিতের (এ+বি) এর সূত্র, না জ্যামিতির সম্পাদ্য-উপপাদ্যের ব্যবহার কিংবা উচ্চ শিক্ষা স্তরে পঠিত পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের জটিল ফর্মুলা কাজে লাগে। মনে হয় না, হিসাববিজ্ঞানের জাবেদা, খতিয়ান কিংবা অর্থনীতির চাহিদা যোগান বা পৌরনীতির কোন জ্ঞান খুব একটা দরকার হয়। প্রকৃতপক্ষে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এর ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালনে সব থেকে বেশী প্রয়োজন বিচক্ষণতা, তীক্ষ্ম অভিযোজন ক্ষমতা এবং ন্যায় পরায়নতা। আর পেশাজীবনে তাকে কখনোই শিক্ষাজীবনে পঠিত পাঠ্য বইয়ের পাতা উল্টাতে হয় না বরং একজন দায়িত্বশীল ম্যাজিস্ট্রেটকে শিক্ষাজীবনের থেকেও বেশী স্ট্যাডি করতে হয় আইন বইয়ের পাতা। সুতরাং বলা যায়, একজন ব্যক্তির পেশাগত জীবনে যে জ্ঞানের প্রয়োজন হয় তা কোন ব্যক্তিই শিক্ষাজীবনে পাঠ্য বই থেকে মুখস্থ করে নিয়ে আসে না। বরং শিক্ষাজীবনের জ্ঞানের আলোকে পেশাগত জীবনে পর্যাপ্ত স্ট্যাডি করার মধ্য দিয়ে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

১১. ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যাংকার, জজ, ব্যারিস্টার শিক্ষাজীবন শেষে পেশা যাই হোকনা কেন, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পঠিত পাঠ্য পুস্তকের জ্ঞান সরাসরি কোন পেশায় কাজে লাগে এমন দৃষ্টান্ত নেই। বরং পেশা যাই হোকনা কেন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রত্যেক দেশেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়ে সময়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে যেমনটি আমাদের দেশেও করা হয়। সুতরাং উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কিংবা চাকুরীতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কেন একাডেমিক পরীক্ষার ফলাফলকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে বলে আমার মনে হয় না।

১২. সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরষ্কারও দেয়া হয় যেখানে বয়স বা শিক্ষাগত যোগ্যতা কোন বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না(মালালা ইউসুফজাই)। আর যুগে যুগে একাডেমিক ডিগ্রী না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেছে অনেকেই এমন দৃষ্টান্তের কোন অভাব নেই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেছেন বেশ কয়েকটি কেবলমাত্র কর্মক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য। আর সত্য হলো, যে ব্যক্তির অভিযোজন ক্ষমতা যত বেশি, কর্মক্ষেত্রে তার অবদানই তত বেশী হবে।

আমার বিশ্বাস উল্লেখিত পরিবর্তনগুলো শিক্ষাক্ষেত্রে আনয়ন করা সম্ভব হলে আমাদেরকে আর কোচিং সেন্টার নিয়ে ভাবতে হবে না, কোচিং সেন্টারগুলোই বরং নিজেদেরকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে দেবে। সেইসাথে উচ্চ মাধ্যমিকের পর কর্মমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকলে লেখাপড়া শেষ করে বেকার থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। প্রত্যেকেই তার যোগ্যতা অনুসারে কেউ চাকুরী করবে, কেউ ব্যবসা, কেউ কৃষিকাজ, কেউবা হয়তো রিক্সা, অটোরিক্সা চালানোর মত পেশাও বেছে নেবে কেননা, সকলে শিক্ষিত হওয়া মানে তো এই নয় যে, রাস্তায় আর রিক্সা, অটোরিক্সা চলবে না।

মোঃ আব্দুল হাই খান
পরিচালক
গাইবান্ধা কম্পিউটার এন্ড আইটি এডুকেশন।
E-mail: haikhan2002@gmail.com

No Comments

    Leave a reply